দেশের প্রায় ১৫০টি উপজেলায় চলমান সরকারি প্রাথমিক ‘স্কুল ফিডিং’ প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতি ও ‘সাগর চুরি’র চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পে শিশুদের পুষ্টির নামে সরবরাহ করা হচ্ছে ফাঙ্গাস পড়া গন্ধযুক্ত পাউরুটি, ওজনে কম পচা ডিম এবং রাসায়নিকযুক্ত কাঁচা-পাকা কলা। যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাত্র ১১টি উপজেলাতেই
দেশের প্রায় ১৫০টি উপজেলায় চলমান সরকারি প্রাথমিক ‘স্কুল ফিডিং’ প্রকল্পে ভয়াবহ দুর্নীতি ও ‘সাগর চুরি’র চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পে শিশুদের পুষ্টির নামে সরবরাহ করা হচ্ছে ফাঙ্গাস পড়া গন্ধযুক্ত পাউরুটি, ওজনে কম পচা ডিম এবং রাসায়নিকযুক্ত কাঁচা-পাকা কলা। যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাত্র ১১টি উপজেলাতেই প্রতি সপ্তাহে কেবল কলা, ডিম ও বানরুটির বাজেট থেকে প্রায় ১৭ কোটি টাকা লোপাট করছেন অসাধু কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো।
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে প্রতিদিন ২৯ লাখ ৫৮ হাজার ৭৫০ জন শিক্ষার্থীর দুপুরের খাবারে ডিম, বানরুটি, দুধ, কলা ও বিস্কুট দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে শিশুদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে বিষাক্ত ও নিম্নমানের খাবার, যা খেয়ে ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে তিন শতাধিক কোমলমতি শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছে। গত ২২ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের শঙ্করবাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একযোগে ২০ জন শিক্ষার্থী এই খাবার খেয়ে বমি ও পেট ব্যথায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়।
অনুসন্ধানে উঠে আসা চুরির চাঞ্চল্যকর চিত্র:
-
ভিজিয়ে রাখা ফাঙ্গাসযুক্ত রুটি: প্রকল্পে ১২০ গ্রাম ওজনের প্রতিটি বানরুটির দাম ধরা হয়েছে ২৪ টাকা। কিন্তু জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার থুপশাড়ের ও তেলিহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জেলা ঘুরে দেখা গেছে, রুটিতে ফাঙ্গাস (ছত্রাক) জমে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। এমনকি ওজনের কারচুপি ঢাকতে রুটি পানিতে ভিজিয়ে রাখার মতো জঘন্য জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে।
-
ডিমের ওজনে শুভঙ্করের ফাঁকি: চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি ডিমের ওজন ন্যূনতম ৬০ গ্রাম এবং দাম ১৪ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সরবরাহ করা হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ গ্রামের সস্তা ও ছোট ডিম। প্রতিদিন প্রতিটি ডিমে ১ টাকা করে কম দেওয়া হলেও সপ্তাহে কোটি কোটি টাকা কর্মকর্তাদের পকেটে ঢুকছে। এর পাশাপাশি ঠিকঠাক সেদ্ধ না করা এবং পচা ডিম দেওয়ার অভিযোগও করেছে শিক্ষার্থীরা।
-
কলার বাজারে হরিলুট: চুক্তি অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ১০০ গ্রাম ওজনের প্রতিটি কলার দাম সাড়ে ১০ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেওয়া হচ্ছে ৯০ গ্রামের কষযুক্ত শক্ত বা কেমিক্যালযুক্ত কলা। উত্তরাঞ্চলের কলার অন্যতম প্রধান হাট দুর্গাদহ বাজারে সরেজমিনে দেখা গেছে, এসব কলার প্রকৃত বাজারমূল্য মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ টাকা। প্রতি কলায় প্রায় ৭ টাকা করে বাঁচিয়ে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২ কোটি টাকা পকেটস্থ করছে অসাধু চক্র।
রাজশাহী বিভাগের ১২টি উপজেলায় পৌনে দুই লাখ শিক্ষার্থীর খাবার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘গণউন্নয়ন সংস্থা (গাক)’-এর দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিপুল পরিমাণ ডিম-কলা পরীক্ষা করে দেওয়া অসম্ভব বলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। এই বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ সতর্ক করে বলেন, “এই খাবারে ব্যবহৃত ক্ষতিকর উপাদানগুলো শিশুদের লিভারের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। এছাড়া বাসি বা পচা খাবার খাওয়ানোর ফলে শিশুরা ডায়রিয়া, জন্ডিস, হেপাটাইটিস-এ ও ই-র মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে পারে।”
সার্বিক দুর্নীতির বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনকে অবহিত করা হলে তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে এই অনিয়ম রুখতে ইতিমধ্যে নতুন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে প্রতিটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং ম্যানেজমেন্ট কমিটি সরাসরি খাবার কমিটির অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং তারা খাবার বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব পালন করবে। অন্যদিকে, প্রকল্পের পরিচালক জানিয়েছেন, কোমলমতি শিশুদের খাবারের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এবং দোষী ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উল্লেখ্য, ভবিষ্যতে দেশের সব সরকারি প্রাথমিকে এই সুবিধা বিস্তৃত করতে আরও ১২ হাজার কোটি টাকা খরচ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
Channel July 36 

















Leave a Comment
Your email address will not be published. Required fields are marked with *